জবা গাছের পরিচর্যা – জবা গাছের সমস্যা ও সমাধান

Last updated on July 10th, 2024 at 08:52 am

জবা ফুল গাছ ছাদ বাগান থেকে শুরু করে গ্রাম বাংলায় সকালের বাড়িতেই আছে। আর বারো মাস জবা গাছ পরিচর্যা করবার সময়ে অনেক রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, সেই সমস্ত সমস্যা নিয়ে আজকে এই প্রতিবেদন। সঠিক যত্ন এবং পরিচর্যা করলে হাইব্রিড জবা ফুলের সৌন্দর্য গোলাপ ফুল কেও হার মানাবে। রূপে রঙে অপূর্ব সৌন্দর্য ফুলগুলি সবারই মন কেড়ে নেয়।

জবা গাছের পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ, আজকে এই প্রতিবেদন থেকে আপনি জানতে পারবেন জবা গাছের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে, এবং সমস্যা সমাধানে কি কি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। হয়তো এই প্রতিবেদন সম্পূর্ন পড়লে, আপনি আপনার জবা গাছের সমস্যার সমাধান পেয়ে যেতে পারেন।

জবা গাছের পরিচর্যা – জবা গাছের সমস্যা ও সমাধান

জবা গাছের ইংরেজি নাম Hibiscus এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যারলাস লিনেয়াস (Carolus Linnaeus) জবা গাছে কোন কোন রোগ দেখা যায়, সমস্যা ও সমাধান ।জবা ফুল(China Rose/Chinese Hibiscus) হল মালভেসি গোত্রের অন্তর্গত চিরসবুজ,পুষ্পধারী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, যার উৎপত্তি পূর্ব এশিয়াতে। ভারতীয় উপমহাদেশে জবা গাছ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন বাংলায় জবা,তামিলে সেম্বারুথি, হিন্দিতে জবা, কুসুম, মালয়লমে সেম্পারাত্তি ইত‍্যাদি।

জবা গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যাওয়া রোগ

এই রোগটি দুটি সময়ে বেশি লক্ষ করা যায়, এক গরমের মরসুমে দ্বিতীয়ত বর্ষার পর পর। জবা গাছে জলের তারতম্য ও ক্লোরোফিলের ঘাড়তি হলে এই ধরনের সমস্যা হয়। জবা গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে একটি সাধারন রোগ।

গাছের গোড়া যদি অতিরিক্ত শুকনো থাকে বা অতিরিক্ত ভেজা থাকে, তাহলে এই রোগ দেখা দেয়। এছাড়াও ক্লোরোফিলের অভাব দেখা দিলে এই সমস্যা হয়, এপসম সল্ট বা ম্যাগনেসিয়াম সালফেট চা চামচের এক চামচ পরিমাণ/পাঁচ গ্রাম হারে এক লিটার জলে গুলে পুরো গাছে স্প্রে করতে হবে সপ্তাহে একবার করে। সারা বছর গাছ সবুজ সতেজ রাখতে এক চা চামচ ইউরিয়া ও এপসম সল্ট, পাঁচ লিটার জলে গুলে মাসে একবার স্প্রে করতে পারেন।

জবা গাছ ঝিমিয়ে পড়া রোগ

বর্ষার পর হঠাৎ রোদ উঠলে আপনার প্রিয় জবা গাছ কেন ঢলে পড়ে জানেন? এর প্রধান কারণ হলো গোড়ার মাটিতে অতিরিক্ত জল জমে থাকার কারনে, যা শিকড়গুলিকে দুর্বল করে এবং পচিয়ে দেয়। এই সমস্যা সমাধানে গাছকে বর্ষার সময়ে সেডের নীচে রাখতে হবে। যদি টবে জল জমে তা ফেলে দিয়ে গোড়ার মাটি আলগা করতে হবে এবং যে কোন কম্পানির ছত্রাকনাশক যেমন- সাফ, ম্যানসার ২ গ্রাম হারে ৫০০ গ্রাম জলে গুলে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। চেষ্টা করবেন টবগুলিকে রৌদ্রে রাখবার, তাতে করে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাবে। চারদিন পরপর তিন থেকে চারবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে দেখবেন দ্রুত জবা গাছ কেমন সুস্থ হয়ে উঠছে। এই প্রদ্ধতি বর্ষার সময়ে সকল গাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

জবা গাছের কুঁড়ি ঝরা রোগ

জবা গাছে কুঁড়ি আসছে, কিন্তু ফোটার আগেই তা বৃত্ত থেকে ঝরে পড়ছে। এটি হওয়ার চারটি কারন আছে- জল কম দেওয়ার কারনে, বোরন সারের অভাব, ছত্রাকের আক্রমন ও অনুখাদ্যের অভাব হলে। ছত্রাকের জন্য সাফ/ম্যানসার পাউডার 2 গ্রাম পরিমাণ এক লিটার জলে গুলে সাত দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। গাছে জলের অভাবের কারনে কুঁড়ি ঝরে যেতে পারে। গাছে সময় মত জল দিলে এবং ছত্রাকের আক্রমন না ঘটলে বুঝতে হবে গাছে অনুখাদ্যের অভাব ঘটেছে। বোরন সারের অভাব হলে, বোরন 20% 1 থেকে 1.5 গ্রাম এক লিটার জলে গুলে ভালো করে গাছে স্প্রে করতে হবে। আর অনুখাদ্যের অভাব পূরণ করতে, মাসে একবার Mobomin, Agromin Gold ,Elisa ব্যাবহার করবেন। গাছের জীবন ধারণের জন্য অনুখাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম, অনুখাদ্য বা Micronutrients সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন- Micronutrients বা অনুখাদ্য কি?

জবা গাছের পরিচর্যা

জবা গাছের পাতা ঝরে পড়া রোগ

পাতা ঝরে পড়া রোগ, মূলত তিনটি কারনে হয়- গোড়ায় অতিরিক্ত জল জমে থাকলে, গাছে কম জল দেওয়ার কারনে ও গাছে নাইট্রোজেনের অভাবে। গাছের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে বাতাস চলাচল খুবই প্রয়োজন৷

  • প্রথমত, গাছের গোড়ায় বেশি জল জমে থাকলে মাটিতে বাতাস চলাচল করতে পারে না ৷ এর ফলে গাছের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে যেতে থাকে অবশেষে গাছ মাড়া যেতে পারে ৷
  • দ্বিতীয়ত, গাছের গোড়ায় কম জল দেওয়ার ফলেও পাতা ঝরে যেতে পারে।
  • তৃতীয়ত, নাইট্রোজেনের অভাব দেখা দিলে পাতা ঝরে যেতে পারে, এক চা চামচ ইউরিয়া সার পাঁচ লিটার জলে মিশিয়ে, সপ্তাহে একবার গাছে স্প্রে করতে হবে।
  • বর্ষাকালে গাছের যত্ন নেওয়ার সহজ ১০টি টিপস বা কৌশল, সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

জবা গাছে ফুল না আসা

জবা গাছের একটা মারাত্মক রোগ ফুল না আসা। এক্ষেত্রে ৮-১০ ইঞ্চি টবের জন্য লাল পটাশ সার এক চা চামচ করে মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে ১৫-২০ দিন অন্তর। গাছে গোড়ায় সার প্রয়োগ করবার আগের দিন অল্প পরিমাণ জল দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দেবেন। টবে সার প্রয়োগ করবার পূর্বে মাটি এক থেকে দেড় ইঞ্চি খুঁড়ে নিয়ে টবের সাইড দিয়ে সার ছিটিয়ে দেবেন, মনে রাখবেন রসায়নিক সার সর্বদা গোড়া ছেড়ে দিতে হয়। রসায়নিক ছাড়া জৈব সার দিতে চাইলে, কলার খোসা সার দু চামচ এবং এক চামচ অনুখাদ্য একত্রে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে পারেন।

মিলিবাগ বা সাদা পোকার আক্রমন

জবা গাছে নানা ধরনের পোকামাকড়ের পাশাপাশি মিলিবাগ এর আক্রমণ খুব বেশি হয়, তাই দেখা মাত্রই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। ঘরোয়া উপায়ে বা রাসায়নিক উপায় এই মিলিবাগ বা দয়ে পোকা দমন করা যায়। এই সমস্যা সমাধানে বিস্তারিত তথ্য একটি প্রতিবেদনে আমি আলোচনা করেছি, সেটা দেখতে “গাছের শত্রু মিলিবাগের বংশ ধ্বংস” এখানে ক্লিক করুন।

জবা গাছের পাতা কোঁকড়ানো রোগ

জবা গাছের পাতা কোঁকড়ানো রোগের অন্যতম কারণ হলো- থ্রিপস বা এফিডস্ নামক শোষক পোকার আক্রমন। এর জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের যেকোনো কীটনাশক এক মিলি হারে এক লিটার জলে গুলে বিকেলে স্প্রে করে দিতে হবে। এছাড়াও অনুখাদ্যের অভাব দেখা দিলে জবা গাছের পাতা কুঁকড়ে যায়।

জবা গাছের জাব পোকার আক্রমন:

মিলিবাগের পাশাপাশি জবা গাছের কচি ডালের অগ্রভাগে, ফুলের কুঁড়ি বা পাতাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাব পোকা দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিকার- ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের যেকোনো কীটনাশক, যেমন – ইমিটাফ প্রয়োগ করবেন।

জবা গাছের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া

যদি জবা গাছের সঠিক বৃদ্ধি না হয় বা নতুন ডাল-পালা না তৈরী হয়, তাহলে বুঝবেন গাছটি অপুষ্টিজনিত কারনে ভুলছে, এর জন্য ১৫ দিন অন্তর একটি সুষম খাবার গাছে দিন। এছাড়াও গাছ ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে বৃদ্ধি থমকে যায়। তাই নিয়ম করে ব্যাকটেরিয়া নাশক এবং ছত্রাকনাশক যেমন-সাফ একত্রে গুলে স্প্রে করতে থাকুন। আর ২০ দিন অন্তর NKP ১০:২৬:২৬ ব্যাবহার করবেন।

প্রিয় পাঠক, এই প্রতিবেদনটি পঠন করবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকের সহযোগিতা “ক্রিয়েটিভিটি গার্ডেনিং” সর্বদা কাম্য করে। গাছই আমাদের একমাত্র সম্পদ যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে পারে, বাঁচিয়ে রাখতে পারে। নিঃস্বার্থে গাছ ভালবাসুন, সকলকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করুন।

আপনাদের যদি এই বিষয়ে কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্সের মাধ্যমে আমাকে জানাতে পারেন। সেগুলোর সমাধান করাবার আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনার মূল্যবান রেটিং দিয়ে উৎসাহিত করুন, সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, সবাই খুব ভালো থেকো নমস্কার।

আপনার মূল্যবান রেটিং দিয়ে উৎসাহিত করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *