বর্ষাকালে গাছের যত্ন নেওয়ার সহজ ১০টি টিপস বা কৌশল, সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

বর্ষাকালে গাছের যত্ন নেওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়, প্রায় প্রতিদিনই কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘের দ্বারা সূর্য অস্পষ্ট থাকে। পরিবেষ্টিত তাপমাত্রার পরিবর্তন, সামঞ্জস্যপূর্ণ তবুও কখনও কখনও অত্যধিক হাইড্রেশন এবং স্যাঁতসেঁতে, উর্বর ভূমির জন্য কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণে বর্ষাকালে গাছপালাকে প্রভাবিত করে অসংখ্য পরিবর্তন। যাইহোক, হতাশ হবেন না, কারণ আমরা বর্ষাকালের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উদ্ভিদ পরিচর্যা কৌশল উপস্থাপন করি।

বর্ষাকালে গাছের গোড়ায় কতটা জল জমেছে সেটি সর্বপ্রথম দেখতে হবে। বাগানের মাটিতে গাছ বসানো থাকলে তার পরিচর্যা একরকম হবে। আবার গাছ যদি টবে বসানো থাকে, তাহলে তার পরিচর্যা অন্যরকম। গাছের গোড়ায় যাতে জল না জমেতে পারে, তার জন্য কি করতে হবে পাশাপাশি বর্ষাকালে গাছে কোন ধরনের সার প্রয়োগ করা উচিত, আর কি উচিত নয় সমস্ত কিছু আলোচনা করব এই প্রতিবেদনে। তবে বর্ষায় বাগান তৈরি বা যত্ন করবার বেশ কিছু সাধারণ নিয়মকানুন মাথায় রাখা জরুরি।

বর্ষাকালে গাছের যত্ন কিভাবে করবেন? কি সার ব্যাবহার করবেন, সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

বর্ষাকালে গাছের যত্ন করবার সহজ ১০টি টিপস বা কৌশল আছে, বর্ষাকালে নতুন গাছপালা অনেক সংক্ষায় জন্মায় কারন সমস্ত গাছপালার বেড়ে ওঠের অদর্শ সময় এই বর্ষাকাল ৷ এই সময়ে গাছ তার সর্বাধিক পুষ্টি ও আর্দ্রতা পায় ৷ সবদিক সবুজে ভরে ওঠে ৷ গাছ বেড়ে ওঠার জন্য যেসব মৌলিক এবং যৌগিক উপাদান প্রয়োজন, বৃষ্টির জলে অধিকাংশ তা রয়েছে। যেমন– নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফেট ও নাইট্রেট আয়ন প্রভৃতি। এ কারণে বৃষ্টির সময় গাছের সতেজতা অনেক গুণ বেড়ে যায়। এই সব উপাদানগুলি গাছ মাটি থেকে এবং সরাসরি গ্রহণ করে থাকে ৷ তবে অনেক সময় বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টির কারণে গাছের গোড়ায় জল জমে গোড়া পচে যায় ৷ বর্ষাকালে গাছের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷

বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে চারা গাছ প্রচুর নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও গাছে সময় মত কীটনাশক ঔষধ স্প্রে করতে হবে, গোড়া থেকে উর্বর মাটি ধুয়ে চলে গেলে জৈব সার দ্বারা, দোঁআশ বা এঁটেল মাটি দিয়ে গোড়া আবার ঢেকে দিতে হবে। এতে গাছ আবার সতেজতা ফিরে পায়। এই ধরনের প্রাথমিক কাজগুলি করতে হবে ৷

বর্ষাকালে গাছের যত্ন

1. অতিরিক্ত জল দেওয়া যাবে না

বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের কারণে, অধিক সময়ে মাটি ভেঁজা থাকে, সুতরাং গাছে জল দেওয়ার পূর্বে মাটি পর্যবেক্ষন করে তবেই জল প্রয়োগ করবেন।

বৃষ্টির জলে পটাসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফেট ও নাইট্রেট আয়রনের মত উপাদান থাকায় গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। তাই আলাদা করে এই সময়ে জল না দেয়াই ভালো। এতে গাছের গোড়া পঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গাছের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে বাতাস চলাচল প্রয়োজন হয়৷ গাছের গোড়ায় বেশি জল জমে থাকলে মাটিতে বাতাস চলাচল করতে পারে না ৷ এর ফলে গাছের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে যেতে থাকে অবশেষে গাছ মাড়া যেতে পারে ৷ বর্ষাকালে কিভাবে গাছর পরিচর্যা করবেন ভিডিও এর লিঙ্ক দেওয়া রইল৷

বর্ষাকালে সাকুলেন্টে বা ক্যাকটাসের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিতে হবে। বর্ষার দিনে এগুলোকে এমন স্থানে রাখবেন না যাতে জল পায়, ঘরের ভিতরে বা বারান্দায় যদি শেলফ থাকে সেই স্থানে রাখবেন, যেন জল না পড়ে। কারণ মরুভূমির গাছ হওয়াতে অতিরিক্ত জল পড়লেই এগুলো মরে যায়।

2. জল নিষ্কাশন ব্যাবস্থার উন্নতি করতে হবে

বর্ষাকালে গাছের গোড়ায় অথবা টবে জল জমে থাকলে, তা নিষ্কাশনের ব্যাবস্থা করতে হবে। টবে গাছ প্রতিস্থাপনের পূর্বে টবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আছে কিনা সে ব্যাপারে খেয়াল রাখা বেশ জরুরি। এখন তো সবাই মাটির অথবা প্লাস্টিকের টব কিনে নেন। সেগুলোতে আগে থেকেই ফুটো করা আছে কি না তা নিশ্চিৎ করে নিতে হবে। যারা বাসায় থাকা প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে পত্র বানান, তাতে ছোট ছিদ্র রাখতে ভুলবেন না।

জল নিষ্কাশন ব্যাবস্থার উন্নতি করতে করনীয়

টবে জল জমে থাকে, সাথে সাথে সেই জল ফেলে দিতে হবে। বাগানে বা জমিতে জল জমলে আল কেটে জল বার করবার ব্যাবস্থা করতে হবে। বর্ষাকালে টবে জল জমা থেকে রেহায় পেতে…….

টবগুলিকে ছাদে বা বারন্দাতে কাত করে রেখে দিতে পারেন অথবা টবগুলিকে বারান্দায় সেডের নীচে রেখে দিতে পারেন।

3. গাছের গোড়ায় মাটি প্রয়োগ

বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে গাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে যায়। মাটিতে থাকা জৈব উপাদান গুলিও মাটির সাথে ধুয়ে যায়। ফলে শিকড় বেরিয়ে যায় ও গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে ৷ সুতরাং বর্ষা আসার আগে মাটির লেভেল বাড়িয়ে দিন। আর গাছের জন্য অবশ্যই ভালো মাটি তৈরি করে নেবেন। এতে গাছ আবার সতেজতা ফিরে পায়। এই ধরনের প্রাথমিক কাজগুলি করতে হবে ৷

4. গোড়ায় মাটি স্যাঁতস্যাঁতে বা ভেজা থাকলে যা করনীয়

বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ গাছের গোড়ার মাটি ভেজা থাকে। দীর্ঘদিন মাটি স্যাতস্যতে বা ভেজা থাকলে গাছ মাড়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে গোড়ার মাটি হালকা খুচিয়ে দিয়ে তাতে ছত্রাকনাশক ছিটিয়ে দিয়ে গাছগুলিকে রৌদ্রে রেখে দিতে হবে, যাতে সম্পূর্ণ মাটি শুকিয়ে যায়।

5. জল নিষ্কাশন ব্যাবস্থার উন্নতি করতে বিশেষ ভাবে মাটি তৈরী

বর্ষাকালের পূর্ব এমন ভাবে মাটি প্রস্তুত করতে হবে, যাতে মাটি খুব দ্রুত জল শুষে নিতে পারে। আর তাই এর জন্য দোঁয়াশ মাটি ব্যবহার করা উপযোগী। মাটি তৈরির ক্ষেত্রে মাটির সাথে জৈব সার মেশানোর সাথে সাথে সাদা বালি ও নুড়িপাথর বেশি পরিমাণে মিশিয়ে নিতে হবে। তাতে জল নিষ্কাশন ব্যাবস্থার উন্নতি হবে।

6. পোকামাকড় এবং পিপড়ে দমন

বর্ষায় আর্দ্র পরিবেশের কারণে গাছে প্রচুর পরিমাণ শামুক এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এরা নতুন পাতার রসাল অংশ বা দুর্বল কান্ড খেয়ে ফেলে এবং গাছের প্রচুর ক্ষতি করে। তাই বর্ষাকালে গাছে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে রয়েছে– নিম অয়েল, নিমখোল, গোলমরিচ গুঁড়া, শুকনো মরিচের গুঁড়া। অনেক সময় প্রাকৃতিক কীটনাশকে কাজ নাও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

এছাড়াও অনেক সময় পিপড়ে বা অন্যান্য ছোট ছোট পোকা টবের নিচে বা টবের মধ্য বাসা তৈরি করে। এসব পোকামাকড় গাছের শিকড় নষ্ট করে দেয়। তাই গাছের টব সরিয়ে নিয়ে পোকামাকড় ধ্বংস করতে হবে।

7. গাছে নিয়মিত ছত্রাকনাশক ও ব্যাকটেরিয়ানাশক স্প্রে করতে হবে

বর্ষাকালে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মতো রোগজীবাণু গাছের মারাত্মক ক্ষতি করে ৷ যার ফলে পাতা ও কাণ্ড পচে বা ক্ষয়ে যেতে পারে ৷ ক্রমাগত বৃষ্টির কারনে বা গাছের গোড়ায় জল জমে থাকলে দুর্বল বা রসাল কান্ড পাচ যায়, এর জন্য প্রথম থেকে ব্যাকটেরিয়া নাশক স্প্রে করতে হবে ৷ এই সম্পর্কে একটি তথ্যমূলক ভিডিও আমার ইউটিউব চ্যানেল আপলোড আছে, ভিডিও লিঙ্ক ৷ এছাড়াও বৃষ্টির কারনে গাছের পাতা কাল হয়ে যাওয়া বা পাতাতে বাদামী বর্ণের ক্ষতের দাগ বা অগ্রভাগের কঁচি পাতা পঁচে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষ করা যায় ৷ গাছপালা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং নিয়মিত ছত্রাকনাশক, ব্যাকটেরিয়ানাশক একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করুন ৷

8. সার প্রয়োগের পরিমান

বর্ষাকালে সার দেওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। যেহেতু বৃষ্টির জলে নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফেট ও নাইট্রেট আয়ন থাকে, তাই বর্ষাকালে বেশি সার প্রয়োগ না করাই ভাল। অত্যধিক রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে গাছ মরে যেতে পারে। তবে, সঠিক মাত্রায় ও পদ্ধতি মেনে সার দিলে গাছের সঠিক বৃদ্ধি হয়।

বর্ষাকালে প্রায়শই ভারী বৃষ্টির কারণে উপরের মাটি ধুয়ে যায়, এবং উপরের মাটি গাছের জন্য পরিমাপিত জলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে গাছের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত মৌলিক পুষ্টি থাকে। সুতরাং বর্ষাকালে গাছগুলিকে একটি সুষম খাদ্য দিন যাতে মাটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির অভাব না ঘটে।

9. খুঁটি দেওয়া

বেশি বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাসের কারনে গাছের নরম ডালগুলি হেলে পড়ে। তাই গাছের অবস্থান ঠিক রাখার জন্যে গাছের সঙ্গে খুটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এতে গাছ সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে। হেলে পড়ে যাবে না।

10. ডাল ছাঁটাই

বর্ষাকালে একটানা বৃষ্টির ফলে গাছ খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। গাছের অতিরিক্ত ডালের জন্য গাছের ভেতরে বাতাস চলাচল এবং গোড়ায় রৌদ্র পৌঁছাতে পারে না। তাই বর্ষার কিছু আগেই গাছের ডাল হার্ড প্রুনিং করতে হবে। ফলে গাছে পোকামাকড়ের আনাগোনা কমে যাবে।

11. আগাছা পরিষ্কার

বর্ষাকালে আগাছা জন্মানোর প্রবণতা অনেক বেশি। তাই নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার ও ডাল কাঁটাই- ছাটাই করার ব্যবস্থা করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার না করলে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি অন্যান্য আগাছা গ্রহন করতে থাকবে।

বর্ষাকালে উচ্চ আর্দ্রতার ও বৃষ্টিপাতের কারণে গাছ প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য গাছের যত্ন নেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। গাছপালাগুলিকে তাদের পর্যাপ্ত নিষ্কাশন, কীটপতঙ্গ এবং ছত্রাক থেকে রক্ষা করে এবং প্রবল বাতাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এমনকি সবচেয়ে আর্দ্র পরিস্থিতিতেও বৃদ্ধি পেতে উত্সাহিত করতে পারেন।

আপনার মূল্যবান রেটিং দিয়ে উৎসাহিত করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *