নন্দিনী ফুল গাছের প্রতিস্থাপন ও সম্পূর্ন পরিচর্যা | Easy to Grow and Care Nandini Flower Plant

Last updated on November 26th, 2023 at 08:26 pm

বর্তমানে গোলাপের বিকল্প ফুল নন্দিনী। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে গোলাপ, আবার সোজা পাতাসহ ডালগুলি দূর থেকে অনেকটা টিউলিপের মতো দেখায়। গোলাপের ন্যায় মনোমুগ্ধকর দেখতে ফুলগুলির নাম নন্দিনী।

গোলাপের বিকল্প হলেও নন্দিনী ফুল গাছের প্রতিস্থাপন ও সম্পূর্ন পরিচর্যা | Easy to Grow and Care Nandini Flower Plant সম্পূর্ন আলাদা। নন্দিনী খুবই সুখী গাছ তবে এই গাছের ফুলগুলির স্থায়িত্ব অনেক বেশি, তাই-তো ফুলের দামও আকাশছোঁয়া।

নন্দিনী ফুল গাছের প্রতিস্থাপন ও সম্পূর্ন পরিচর্যা | Easy to Grow and Care Nandini Flower Plant

নন্দিনী ফুল বিভিন্ন রঙের দেখতে হয়, বাহারি এই ফুল বেশ নজরকারা। ইংরেজিতে লিসিয়েন্থাস নামে পরিচিত এই নন্দিনী ফুল। যেহেতু এ ফুলের স্থায়িত্ব অনেক বেশি তাই ফুলের অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে অনেক।জেনেটিনসিয়া পরিবারের এই ফুলটির বিজ্ঞানসম্মত নাম ইউস্টোমা গ্রান্ডিফ্লোরাম (Eustoma grandiflorum)গ্রান্ডিফ্লোরাম জাপানি ভাষায় তরুকোগিকি ও আমেরিকায় “আমেরিকান গোলাপ” নামে পরিচিত। ড: উদ্দিন জাপান থেকে বীজ ও মাটি নিয়ে এসে ২০০৭ সালে সেই মাটিতে ফুলটি ফুটিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় সতের বছর এই বিদেশী ফুল নিয়ে কাজ করছেন ঢাকা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ‍্যালয়ের উদ‍্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম‍্যান ও সহযোগী অধ‍্যাপক এ.এফ. এম.জামাল উদ্দিন। তিনি এই ফুলটির নাম দিয়েছেন নন্দিনী।

ধারণা করা হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রকি পর্বত অঞ্চলে ইউস্টোমার উৎপত্তি। মেক্সিকো, ক‍্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর অংশের উষ্ণ অঞ্চলেও এই ফুল হয়। উৎপত্তিস্থল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে হলেও এই ফুলের চাষ নিয়ে জাপানে গবেষণা হয়েছে। ভারত সহ অন্যান্য দেশে যেমন- ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, থাইল‍্যান্ড, চীন, নেপাল, বাংলাদেশ, ভূটানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ফুলের জনপ্রিয়তা ও বাণিজ‍্যিক উৎপাদন দিন দিন বেড়েই চলেছে।

নন্দিনী ফুল গাছের প্রতিস্থাপন ও সম্পূর্ন পরিচর্যা | Easy to Grow and Care Nandini Flower Plant
নন্দিনী ফুল গাছের প্রতিস্থাপন ও সম্পূর্ন পরিচর্যা

বৈশিষ্ট্য(Characteristics):-

জেনেটিনসিয়া পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ নন্দিনী। এটি মূলকান্ড এবং পাতায় বিভক্ত, পাতার রং নীলাভ সবুজ বর্নের। গাছটি ২০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রায় ৪৫টি রঙের নন্দিনী ফুল হয়ে থাকে, ফুলগুলি গাছ থেকে তোলার পর ১৫ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। একটি গাছে একাধিক ফুল ফোটে, কমপক্ষে ৮০ থেকে ১২০টি ফুল।

নন্দিনী ফুলের গাছ অনেক বেশি সহনশীল,ঝড়, বৃষ্টি, প্রচন্ড গরম বা অন‍্যান‍্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফুল সমেত গাছ অক্ষত থাকে। প্রতিটি ফুল শক্ত বৃন্তের ওপর থাকে বলে কখনো নুয়ে পড়ে না। একটানা পনের দিন পর্যন্ত ফুলটি গাছে স্থায়ী হয়, যার জন্য এই ফুলের দাম খুব বেশি। বর্তমানে প্রতিটি নন্দিনী ফুলের বাজার মূল্য ১২০-১৫০ টাকা, গোলাপ কিংবা জারবেরার তুলনায় এর মূল্য ৮-১০ গুণ বেশি হয়। ফুলদানিতে জলের সাথে সামান‍্য সুক্রোজ মিশিয়ে এই ফুল পঁচিশ দিন অবধি তাজা রাখা যায়।

বংশবিস্তার:-

বীজ থেকে গাছের বংশবিস্তার করা হয়। নন্দিনী ফুলের বীজ খুব ছোট হওয়ায় বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে অঙ্কুরোদগম করতে হয়। অঙ্কুরোদগমে সময় লাগে সাধারণত ১০-১২ দিন। কিন্তু চারায় চার জোড়া পাতা তৈরী হতে ৮০-৯০ দিন সময় লাগে। বীজ থেকে চারা উৎপাদনে দীর্ঘ সময় ও কারিগরি দক্ষতার না থাকলে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানো সম্ভব নয়।

চারা সংগ্রহ:-

স্থানীয় নার্সারিতে নন্দিনী গাছের চারা কিনতে পাওয়া যায়। তবে কেনার সময়ে পরিষ্কার, রোগমুক্ত, নিখুদ চারা সংগ্রহ করতে হবে। তবে অনলাইল থেকে এই গাছ সংগ্রহ না করাই ভাল। চারা গাছের বাজার মূল্য ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্য।

স্থান নির্বাচন:-

নন্দিনী গাছের জন্য উঁচু এবং ঢালু স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেখানে সহজে জল জমতে না পারে এবং রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে নন্দিনী গাছ বেড়ে ওঠার জন্য অনুকূল। তবে গরমের সময়ে এবং বর্ষাতে গাছ বারান্দায় তুলে রাখাতে হবে।

[আরও পড়ুন: Top 10 BEAUTIFUL BLUE FLOWERS CARE WITH NAMES & PICTURES]

মাটির ব্যবস্থাপনা:-

সাধারণত বেলে-দোআঁশ এবং জৈব পদার্থযুক্ত মাটি এই ফুল চাষের জন্য উপযুক্ত। দুভাগ গার্ডেন সয়েল(বেলে-দোআঁশ),একভাগ ধানের চিটে ও অর্ধেক পরিমাণ ভার্মিকম্পোস্ট বা একবছরের পুরোনো পচানো গোবর সার বা পাতা পচা সার।

[আরও পড়ুন: লন্ঠন জবা গাছের পরিচর্যা | How to grow and care Lanthan jaba]

আলোর ব্যবস্থাপনা:-

এই গাছ ঝলমলে সূর্যের আলো পছন্দ করে তাই বলে গ্রীষ্মকালে সূর্যের প্রখর তাপ এই নন্দিনী গাছের জন্য বিপদজনক। এই ফুল অক্টোবরের শেষের দিক থেকে ফোটা শুরু করে। তাই শীতের সময়ে বাইরের মিষ্টি রোদে এবং গরমকালে উজ্জ্বল হালকা আলো আসে এরকম ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে।

[আরও পড়ুন: টবে জবা গাছ করবার সহজ কিছু টিপস্ | How To Grow Joba Flower Plant In Pots]

জলের ব্যবস্থাপনা:-

এই গাছ আদ্র ভেঁজা মাটি পছন্দ করে কিন্তু গাছের গোড়ায় জল জমা একদম পছন্দ করে না। তাই শীতকালে সপ্তাহে একদিন জল দিতে হবে। তারপর যখন টবের ওপরের মাটি এক ইঞ্চি শুকিয়ে যাবে তখন আবার জল দিতে হবে। এবং গরমকালে টবের মাটি হাতদিয়ে পরীক্ষা করে গাছের গোড়ায় জল দিতে হবে। বর্ষাকাল গাছ বারান্দায় তুলে রাখাতে হবে এবং প্রয়োজন বুঝে জল দিতে হবে।

[আরও পড়ুন: জবা গাছের কাটিং থেকে চারা তৈরির সহজ পদ্ধতি]

খাবারের ব্যবস্থাপনা:-

টবে গাছ বসানোর এক মাসের মধ্য কোন রাসায়নিক সার ব্যাবহার করা যাবে না। ৮ ইঞ্চি টবের গাছের জন্য হাঁফমুঠো পরিমাণ জৈব সার দিলে ভালো হয়। জৈব সারের মধ্য কলার খোসা, ডিমের খোসা, হাঁড় গুড়ো, শিং কুঁচি ,পাতাপচা সার, সরিষার খোল প্রভৃতি দেওয়া যেতে পারে। ৮ ইঞ্চি টবের জন্য হাঁফমুঠো (এক বছরের পুরনো গোবর সার/ পাতা পঁচা/ভার্মিকম্পোস্ট), আর নিতে হবে এক চামচ হাঁড় গুড়ো, এক চামচ শিং কুঁচি, এক চামচ অনুখাদ্য একত্রে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় ব্যাবহার করতে হবে । এটি আপনারা ৩০ থেকে ৪০দিন অন্তর ব্যাবহার করবেন।

গাছে ফুল আশার আগে উচ্চ পটাশিয়াম যুক্ত খাবার প্রয়োগ করতে হবে। আট ও দশ ইঞ্চি টবের জন‍্য এক চামচ সর্ষের খোল ও এক চামচ পটাশ ভালো করে মিশিয়ে প্রতি কুড়ি দিন অন্তর অন্তর মাটিতে দিয়ে জল ঢেলে দিতে হবে। সার দেওয়ার আগের দিন টবের মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।

রোগপোকা নিয়ন্ত্রণ :–

নন্দিনী গাছে ফাঙ্গাসের আক্রমণ খুব বেশি দেখা যায়। তাই গাছের গোড়ায় জল জমতে দেওয়া যাবে না, জমলে ফাঙ্গাস লেগে পাতা পচে যায়I তাই সাতদিন পর পর যেকোন ফাঙ্গিসাইড সাফ / ব‍্যাভিস্টিন / ব্লাইটক্স / M45 একলিটার জলে একগ্রাম দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে সাতদিন অন্তর অন্তর গাছে স্প্রে করতে হবে। এবং মাটিতেও কিছু ফাঙ্গিসাইড ১৫ দিন অন্তর অন্তর ছিঁটিয়ে দিতে হবে।

পাতা খাওয়া পোকার জন‍্য ডাইমেথয়েড ৩০% কম্পোজিসনের যেকোন পেস্টিসাইড রোগর প্লাস / টাফগর এক লিটার জলে তিরিশ ফোঁটা মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে সাতদিন বা দশদিন অন্তর অন্তর। এছাড়াও প্রথম থেকে নীম ওয়েল (Neem Oil) Continue ব্যাবহার করলে কোন ধরনের পোকা- মাকড়ের আক্রমন ঘটে না।

[আরও পড়ুন: নীল অপরাজিতার পরিচর্যা | How to grow & care Blue Aparajita Flower Plant]

[আরও পড়ুন: রাতের রানী নাইট কুইন গাছের পরিচর্যা | How To Care For Queen Of The Night Flower]


প্রিয় পাঠক, এই প্রতিবেদনটি পঠন করবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকের সহযোগিতা “ক্রিয়েটিভিটি গার্ডেনিং” সর্বদা কাম্য করে। গাছই আমাদের একমাত্র সম্পদ যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে পারে, বাঁচিয়ে রাখতে পারে। নিঃস্বার্থে গাছ ভালবাসুন, সকলকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করুন।

আপনাদের যদি এই বিষয়ে কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্সের মাধ্যমে আমাকে জানাতে জানাবেন। সেগুলোর সমাধান করাবার আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনার মূল্যবান রেটিং দিয়ে উৎসাহিত করুন, সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, সবাই খুব ভালো থেকো নমস্কার।

4.6/5 - (5 votes)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *